মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

উপজেলার ঐতিহ্য

 

ইতিহাস-ঐতিহ্য ও উন্নয়ন অগ্রগতিতে

নেত্রকোণা সদর উপজেলা।

 

নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর-বাওর, বন-জঙ্গলের জনপদ ছিল সমগ্র নেত্রকোণা। লোক সাহিত্য সংগ্রাহক ও গবেষকদের মতে পূর্ব ময়মনসিংহ হল লোক সাহিত্য সংস্কৃতির এক তীর্থ ভূমি। নেত্রকোণার সন্তান চন্দ্র কুমার দে সংগৃহীত এবং ডঃ দীনেশ চন্দ্র সেন সম্পাদিত বিশ্ব নন্দিত গ্রন্থ মৈমনসিংহ গীতিকা প্রকাশের পর থেকে পূর্ব ময়মনসিংহকে অনেক গবেষক মৈমনসিংহ গীতিকা অঞ্চল বলেও চিহ্নিত করে থাকেন। এই মৈমনসিংহ গীতিকা অঞ্চলের সীমানা চিহ্নিত করা হয় উত্তরে গারো পাহাড়, দক্ষিণে মেঘনা-যমুনার সঙ্গমস্থল, পশ্চিমে ব্রহ্মপুত্র নদ এবং পূর্বে সুরমা-কুশিয়ারা নদী। এই মৈমনসিংহ গীতিকা অঞ্চলের লোকসাহিত্য-সংস্কৃতি, ভৌগলিক ও ঐতিহাসিক বিচার বিশ্লেষণে কেন্দ্রবিন্দু হলো নেত্রকোণা সদর থানা। ১৮৮২ সনে নেত্রকোণা সদর থানা, দূর্গাপুর থানা ও কেন্দুয়া থানা সমন্বয়ে গঠিত হয় নেত্রকোণা মহুকুমা।

১৭৬৪ সনে শুরু হয় ঐতিহাসিক ফকির বিদ্রোহ। এই ফকির বিদ্রোহের ঢেউ দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ে নেত্রকোণা অঞ্চলে। নেত্রকোণায় ফকির বিদ্রোহ পরিশেষে টিপু শাহ পাগলের নাম অনুসারে পাগলপন্থী বিদ্রোহরূপে খ্যাত হয়ে উঠে। পাগলপন্থী পীর করম শাহ পাগলের অসংখ্য শিষ্য ছিল গারো-হাজং জনগোষ্ঠীর লোক। তাঁর স্ত্রী ব্রাহ্মনকন্যা সন্ধিদেবী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ পূর্বক সন্ধিবিবি নাম ধারন করে করম শাহ পাগলের সংগে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের সন্তান টিপু পাগল। ফকির বিদ্রোহ-পাগল বিদ্রোহের এক মহান ক্ষেত্র ছিল নেত্রকোণা। সপ্তদশ শতকের শেষভাগে নাটুরকোনায় বিদ্রোহ দমনকল্পে জমিদারদের সহায়তা প্রদানের নিমিত্তে স্থাপিত হয় একটি পুলিশ ফাঁড়ি বা চৌকি। কথিত আছে পাগলপন্থী বিদ্রোহীরা এই ফাঁড়িটি লুন্ঠন করে নিয়ে গেলে ফাঁড়ির কর্মকর্তা কর্মচারীগণ আত্মরক্ষার্থে চলে আসে বর্তমান নেত্রকোণা সদর থানা কার্যালয় ভবনে। কিন্তু বর্তমান নেত্রকোণা ছিল আদিকালে সাতপাই মৌজাস্থ কালীমন্দির কেন্দ্রিক কালীগঞ্জ বাজার নামক স্থানে। পুলিশ ফাঁড়িটি কালীগঞ্জ বাজারে স্থানান্তরিত হয়ে গেলেও কাগজে কলমে থেকে যায় নাটোরকোনা। পরে ১৯৩৮ সনে এই পুলিশ ফাঁড়িটিকেই করা হয় পূর্ণাঙ্গ থানা। কাগজে-কলমে নাটোরকোনা, ইংরেজদের সাহেবী উচ্চারণে হয়ে যায় নেত্রকোণা। পরবর্তীতে এই নেত্রকোণা নাম অনুসারে ১৮৮২ সনে নেত্রকোণা মহকুমা এবং ১৯৮৪ সনে নেত্রকোণা জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ সময় নেত্রকোণা লোক সমাজে কালীগঞ্জ বাজার নামে খ্যাত ছিল। বর্তমানে কালীগঞ্জ বাজার শব্দটিও প্রায় বিলুপ্তির পথে। এখন নেত্রকোণা নাম হলো একটি শ্বাশত সত্য। তাই কবি জীবন চৌধুরীর ভাষায় বলতে হয় ........

‘‘নয়নের কোনে একটি সূর্য জ্বলছে অবিরাম

সে আমার জন্মভূমি নেত্রকোণা তার নাম’’

ধানের দেশ, গানের দেশ, মৎস্য সম্পদের দেশসহ পাট উৎপাদনের এক রত্নভান্ডার ছিল নেত্রকোণা। নেত্রকোণার সদর থানার সকল গ্রাম ছিল পাট সম্পদে সমৃদ্ধ। আজও নেত্রকোণা শহরের পাটপট্টি সেই সময়কার পাট সম্পদের ঐতিহ্য বক্ষে ধরে চলছে নীরবে-নিভৃতে। নেত্রকোণা সদর থানার কংসের চিতল, রুই, কাতল এবং ভাওয়াল, গোবিন্দ চাতল, বর্ণি বিলের শিং মাছ, মাগুর মাছ, কৈ মাছের কথা ক্রমশ অতীতের গল্পে পরিণত হচ্ছে। এই নেত্রকোণা থানা আদিকালে ছিল নদী-নালা, খাল-বিল-ঝিল, বন-জঙ্গলের জনপদ। ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশ পরিস্থিতি ছিল শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতিসহ সার্বিক উন্নয়ন অগ্রগিতর সহায়ক। এই সুষম পরিবেশ ছিল নেত্রকোণার মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক সম্প্রীতির নিয়ন্ত্রক শক্তি। বর্তমানে নেত্রকোণার অধিকাংশ নদী-নালা, খাল-বিল-ঝিল শুকিয়ে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে বন-জঙ্গল। সেজন্য নেত্রকোণা থানা আজ পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখোমুখি দন্ডায়মান। আর প্রতি বছরের অকাল বন্যাসহ ২০০৪ সনের ১৪ই এপ্রিল, ১লা বৈশাখাখের প্রলয়ংকরী কাঞ্চনপুর টর্ণেডো নেত্রকোণার পরিবেশ বিপর্যয়ের এক দৃষ্টান্ত। আজ সর্বাগ্রে প্রয়োজন পরিবশে উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ।

এসব ইতিহাস-ঐতিহ্যের সংগে ধর্ম-কর্ম আন্দোলন সংগ্রাম, বিপ্লব-বিদ্রোহ, প্রেম-বিরহ সকল কিছুর লীলাভূমি রূপে বেড়ে উঠতে থাকে নেত্রকোণা সদর। বৃটিশ শাসনামলে স্বদেশী আন্দোলনের তহবিল সংগ্রহে ১৯১৩ সনের শ্রাবণ মাসের ভরা বর্ষায় চারণ কবি মুকুন্দ দাসের নেতৃত্বে সুকৌশলে ‘হরে কৃষ্ণ হরে রাম’ কীর্ত্তনের বাদ্য-বাজনার ছলে সোয়ারীকান্দা গ্রামের ধণাঢ্য জোতদার মহাজন চৈতন সাহার বাড়ি বিপ্লবী কর্মকান্ডের মাধ্যমে নগর ২০ হাজার টাকা এবং ১ তোলা ওজনের ১ শত স্বর্ণের মোহর সংগ্রহ, তে-ভাগা আন্দোলনে হান্নান মৌলভী, আলতাব আলী ও খুশুদত্ত রায়ের উপস্থিতিতে ফটিক শেখ, লেন্দু ও ফজর আলীর নেতৃত্বে প্রায় ৫ শতাধিক লোকের বাংলা গ্রামের জোতদারদের জমির পাকা ধান বলপূর্বক কর্তন এবং দুই মুসলিম গৃহবধু কর্তৃক অকুস্থল থেকে জোতদারের ভাড়াটিয়া দুই সিপাই এর রাইফেল দা হাতে কেড়ে নেয়া ও পরে থানায় রাইফেল জমাদান, ১৯৪২ সনে নেত্রকোণা সদরের বালী গ্রামের হান্নান মৌলভীর পৃষ্ঠপোষকতায় সোভিয়েত সুহৃত সমিতি আয়োজিত ফ্যাসিবাদ বিরোধী কৃষক সমাবেশ পশ্চিম বাংলার প্রাক্তন মূখ্যমন্ত্রী বসুর জ্বালাময়ী বক্তব্য, ১৯৪৫ সনের ৮, ৯, ১০ এপ্রিল নেত্রকোণা গাড়ার মাঠের সর্বভারতীয় কৃষক সম্মেলন কৃষকের গর্ব, নেত্রকোণার অহংকার। এই সম্মেলনের প্রস্তুতি কমিটির আহবায়ক ছিলেন শচীন চক্রবর্তী এবং স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রধান ছিলেন হান্নান মৌলভী। পূর্বে উল্লেখিত ‘সোভিয়েত সুহৃত সমিতি’র সম্পাদক ছিলেন সাতপাই কালীবাড়ির ক্ষীতিশ চন্দ্র সরকার। সর্বভারতীয় কৃষক সম্মেলনের প্রস্তুতি পর্ব চলে মাস ব্যাপী। আর চাঁদা হিসেবে সংগৃহীত হয় শুধু বাঁশ। ফলে হান্নান মৌলভীর কর্মদক্ষতায় গাড়ার মাঠ হয়ে উঠে এক বাঁশের নগরী। বৃটিশ বিরোধী সংগ্রামের চলমান অসহযোগ আন্দোলনের সমর্থনে ১৯২১ সনে চন্দ্রনাথ হাইস্কুল গ্রাঙ্গণে স্বদেশী পণ্যের তিন দিন ব্যাপী প্রদর্শনীর কথা স্বর্ণাক্ষরে লিখা থাকবে নেত্রকোণার সংগ্রাম ইতিহাসে। এই প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী আচার্য্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। ১৯২৮ সনে একই স্থানে একই চরিত্রের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়, যা উদ্বোধন করেন বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদের ডেপুটি চীপ হুইপ অমরেন্দ্র নাথ ঘোষ। বৃটিশ বিরোধী স্বদেশী আন্দোলনে উপরোল্লিখিত সকল কর্মকান্ড ও লড়াই সংগ্রামের ইতিহাসে নেত্রকোণা ছিল এক সমহান ঐতিহ্য। ১৯৪৭ সনে দেশ বিভাগের প্রাক্কালে মুসলিমলীগ কর্তৃক ১৬ই আগষ্ট প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস ঘোষণা করা হলে আকবর আলী এম.এল.এ সভাপতি এবং কংগ্রেস নেতা কুমোদ রঞ্জন বিশ্বাসকে সম্পাদ করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় শান্তি কমিটি গঠন করা হয়। পাকিস্তান আমলেও এসে থেকে যায়নি নেত্রকোণার লড়াই সংগ্রামের ইতিহাস। ১৯৫৩ সনের প্রথম দিকেই মোক্তারপাড়া মাঠে স্থানীয়ভাবে টি.আই.এস. নূরুন্নবী চৌধুরী আহবায়ক এবং মির্জা আসাদুজ্জামান আল ফারুক (প্রাক্তন আইন সচিব) কে যুগ্ম আহবায়ক করে গঠিত তমদ্দুন মজলিস কমিটির ডাকে বাংলা ভাষার প্রতি পাকিস্তান সরকারের অবজ্ঞা প্রদর্শনের প্রতিবাদে অনুষ্ঠিত হয় এক বিশাল প্রতিবাদ সভা। ১৯৪৯ সনে নেত্রকোণা কলেজের ইতিহাসের শিক্ষক জনাব আমীর উল্লাহ চৌধুরীকে আহবায়ক এবং সর্বজনাব ইনছান ভূঁইয়া উকিল, অছিম উদ্দিন, কে.এম. ফজলুল কাদের এডভোকেট, গাজী গোলাম মোস্তফা, ওয়াজেদ আলী প্রমুখ ব্যক্তিবর্গের নেতৃত্বে নেত্রকোণায় গঠিত হয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। ভাষা আন্দোলনের চেতনায় গঠিত ৫৪ সনের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনেও নেত্রকোণার ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল। আইউব বিরোধী আন্দোলনেও নেত্রকোণা লড়াই-সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু ছিল নেত্রকোণা কলেজ। ৬৯ সনের গণঅভ্যুত্থানেও নেত্রকোণা কলেজের ছিল অগ্রণী ভূমিকা। ৫২, ৫৪, ৬৯ এবং ৭০ এর আন্দোলনের পথ ধরে আসে ৭১ এর ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধ। ফকির বিদ্রোহ থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি লড়াই সংগ্রামে নেত্রকোণা থানার ছিল এক গৌরব-উজ্জ্বল ভূমিকা। ১৯৭১ সনের ৯ই ডিসেম্বর নেত্রকোণা মুক্ত দিবসের সম্মুখে সমরে শহীদ হন নেত্রকোণা সদর থানার (১) আবু খাঁ (গাবরাগাতি) (২) আব্দুর রশিদ (খাটপুড়া) (৩) আব্দুস সাত্তার (গাবরাগাতি)।

বিদ্রোহ-বিপ্লব, লড়াই-সংগ্রাম ছাড়াও বহু প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে মোকাবেলা করে এগিয়ে যেতে হয়েছে নেত্রকোণাকে। বাংলা ১১৬৯ সালের ভূমিকম্প, বাংলা ১২৯২ সালের ৩০ আষাঢ়ের রথ যাত্রা দিবসের ভূমিকম্প, বাংলা ১৩০৪ সালের ভূমিকম্প ও বাংলা ১৩২৬ সালের প্রলয়ংকরী বান উলট-পালট করে দেয় নেত্রকোণার ভূ-প্রকৃতি। ফলে প্রকৃতির তান্ডবলীলার বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছে নেত্রকোণাকে। লড়ছে আজো, লড়তে হবে হয়তো অনন্তকাল। ১৮৮১ সনে সমগ্র নেত্রকোণা মহুকুমার মোট জনসংখ্যার ৩,৫৮,০৩২ জন মুসলমান, ২,০৬,৬১৪ জন হিন্দ্র, ৯,৫০৪ জন প্রেতোপাসক, ৬১৭ জন খ্রষ্টান ছিল। সংখ্যার দিক থেকে মুলিম প্রাধান্য থাকলেও ইংরেজ শাসক গোষ্ঠীর রোষানলের শিকার ছিল মুসলিম জনতা। আবার সামাজিক শক্তি বিচারে পীর ফকির প্রভাবাধীন মুসলিম জনগোষ্ঠী ছিল অনেকাংশে বলীয়ান। হিন্দুদের রাষ্ট্র শক্তির আনুকূল্য লাভ ও মুসলিমদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে সামাজিক সম্প্রীতি অত্রাঞ্চলে সর্বদা ছিল সুদুঢ় ভিত্তির উপর দন্ডায়মান। ফলে নেত্রকোণা আবহমান কাল থেকে ছিল একটি বিশেষ ব্যতিক্রমধর্মী তাৎপর্যমন্ডিত মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন এক জনপদ। আর এই সামগ্রিক চেতনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল নেত্রকোণা সদর। যার প্রতিচ্ছবি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, লোকশিল্প, সাহিত্য-সংস্কৃতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন, ইতিহাস-ঐতিহ্যসহ সর্বক্ষেত্রে দৃশ্যমান। 

 

(ক) সীমানাঃ অপরূপ প্রাকৃতিক সুষমামন্ডিত নেত্রকোণা সদর উপজেলা ঢাকা বিভাগের উত্তরে অবস্থিত। এই উপজেলার উত্তরে দূর্গাপুর ও কলমাকান্দা উপজেলা, পূর্বদিকে বারহাট্টা ও আটপাড়া উপজেলা, দক্ষিণে কেন্দুয়া ও ময়মনসিংহ জেলার গৌরিপুর উপজেলার অংশ বিশেষ এবং পশ্চিমে পূর্বধলা উপজেলা।

রাজধানী ঢাকা শহের থেকে সড়ক পথে ১৬০ কিঃ মিঃ দূরে দেশের উত্তর পূর্ব কোনায় অবস্থিত নেত্রকোণা সদর উপজেলা। ময়মনসিংহ জেলা সদর থেকে ৪০ কিঃ মিঃ দূরে নেত্রকোণা শহরের প্রাণকেন্দ্র উপজেলা কমপ্লেক্স অবস্থিত।

(খ) অবস্থানঃ নেত্রকোণা সদর উপজেলা ২৪˚৪৭¹ও  ২৪˚৫৮¹ উত্তর অক্ষাংশের মধ্যে এবং ৯০˚৩৮- ৯০˚৫০¹ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত। এ উপজেলার আয়তন ৩৪০.৩৫ বর্গ কিঃ মিঃ। ইতিহাস ঐতিহ্যের বহু লীলাখেলা বক্ষে ধারণ করে ১টি পৌরসভা, ১২টি ইউনিয়ন, ২৮০টি মৌজা, ৪৫টি মহল্লা, ৩২৮টি গ্রামের সমন্বয়ে গঠিত এ উপজেলা।

(গ) ঐতিহাসিক স্থানঃ

আধ্যাত্মিক পুরুষ হযরত শাহসুলতান কমর উদ্দিন রুমী (রঃ) এর মাজারঃ

হযরত শাহসুলতান কমর উদ্দিন রুমী (রঃ) বাংলাদেশে ১০৫৩ ইং সনে ১২০ জন সফর সঙ্গীসহ ইসলাম প্রচারে আসেন। ঐতিহাসিকদের মতে এটিই ইসলাম প্রচারে আগত প্রথম মিশন। তিনি উপ মহাদেশের বহু অঞ্চল অতিক্রম করে বাংলাদেশের কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, বগুড়া হয়ে পরিশেষে নেত্রকোণা সদর থানার মদনপুরে আসেন। তখল বাংলায় চলছিল বৌদ্ধ ও সনাতন হিন্দুদের সংঘর্ষ। আবার হিন্দুদের বর্ণপ্রথাতেও ক্ষতবিক্ষত ছিল লোক সমাজ। এই জটিল মুহুর্তে ইসলামের সুফীবাদের বাণী আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয় গোটা সমাজকে। তাই তিনি উদার-উদাস প্রকৃতির বিচিত্র প্রাকৃতিক শোভার সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করে নিয়ে দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হন ইসলামের বানী, শান্তির চেতনা। সে চেতনার সারমর্ম ছিল মানবপ্রেমের রসসিক্ত সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধ।

 

(ঘ) স্মৃতি সৌধঃ

১. সাতপাই মগড়া নদীর তীরে অবস্থিত স্বাধীনতা স্মৃতিসৌধ

২. নেত্রকোণার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার

৩. মিতালী সংঘ নির্মিত ‘‘বদিউজ্জামান মুক্তা শহীদ স্মৃতিসৌধ’’

(ঙ) উল্লেখযোগ্য রনাঙ্গণঃ

১. ঠাকুরাকোনা ব্রীজ অপারেশন যুদ্ধ। ইহার পর পাকসেনাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়।

২. মুক্ত দিবসে কৃষি ফার্মের যুদ্ধ। ঐ যুদ্ধে তিনজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।

৩.  ৭ই জুলাই কংশ নদীতে বাশাটির নিকটস্থ যুদ্ধ। ঐ যুদ্ধে নেত্রকোণা থানার দারোগা আব্দুর রশিদ, আনসার এ্যাডজুটেন্ট আঃ মালেক, লাল মিয়া ধৃত হয়ে বংড়া ক্যাম্পে প্রেরিত হয়।

 

(চ) ধর্মীয় ব্যক্তিত্বঃ

নেত্রকোণা সদর থানার সতরশ্রী গ্রামের মৌলানা আকবর আলী রেজভী একজন খ্যাতিমান পীর। কুমিল্লা অঞ্চলে রয়েছে তাঁর অসংখ্য শিষ্য। নেত্রকোণার ছেওপুর গ্রামের মৌলানা আজিজুর রহমান একজন স্বনামধন্য আলেম। তিনি এন.আকন্দ আলীয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ছিলেন। বর্তমানে মোক্তারপাড়া জামে মসজিদের ইমাম। নেত্রকোণার টেংগা গ্রামের মৌলানা রইছ উদ্দিন আকন্দ একজন জনপ্রিয় আলেম। নেত্রকোণার দূর্গাশ্রম গ্রামের মৌলানা মুফতী আব্দুল বারী এন.আকন্দ আলীয়া মাদ্রাসার শিক্ষক ও নেত্রকোণার একজন জনপ্রিয় আলেম। এসব আলেমগণ হলেন নেত্রকোণা সদর থানাসহ গোটা নেত্রকোণার ধর্মপ্রাণ মানুষের শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব।

 

(ছ) বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বঃ

নেত্রকোণা সদর থানার শিমুলজানী গ্রামের বিচারপতি প্রয়াত মুজিবর রহমান, উলুয়াটী গ্রামের সাংবাদিক লেখক প্রয়াত মুজিবর রহমান খাঁ নেত্রকোণার গৌরব। বালির আবু আব্বাছ, এমপি, দেওপুরের প্রয়াত এডভোকেট এ.কে ফজলুল হক, এম.এন.এ, স্বাবলম্বীর রোকেয়া বেগম, নারী প্রগতির রোকেয়া কবীর, সি.ডি.এ’র নির্বাহী পরিচালক ফজলুল করিম, প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ কাটলীর অলি নেওয়াজ খান, বাইশদার গ্রামের কে.এম ফজলুল কাদের এডভোকেট, কুনিয়ার এডভোকেট ফজলুর রহমান, শামছুল হক তালুকদার, মেদনীর গাজী গোলাম মোস্তফা, চকপাড়ার আব্বাছ আলী খান, এম.সি.এ, গাবরাগাতির আয়েশা খানম, কাটলীর প্রয়াত গোলাম মোরতুজা ও কর্মরত বিচারপতি বুড়িঝুরির আঃ কদ্দুছ, বালির হান্নান মৌলভী ও শচীনহোম, কাটলীর ডঃ মাসুদুর রহমান খাঁন, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ রৌহার ডাঃ আঃ বারী, সাতপাইয়ের ডাঃ আনিছুর রহমান এবং আমতলার ডাঃ আনোয়ার।

 

(জ) উচ্চপদস্থ সামরিক/বেসামরিক কর্মকর্তাঃ

অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আহসান উল্লাহ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহ মোঃ সুলতান উদ্দিন ইকবাল, কাটলীর অবসরপ্রাপ্ত লেঃ কর্নেল নূর খান, অবসরপ্রাপ্ত তেরী বাজারের মেজর নূরুল হুদা, নোয়ানগরের প্রয়াত আঃ খালেক, এস.ডি.ও প্রখ্যাত ব্যাংকার খাটপুরার এম.এ তাহের, নির্বাহী প্রকৌশলী প্রয়াত বাইশদার গ্রামের আব্দুল কাদের।

 

(ঝ) কৃতি খেলোয়াড়ঃ

চকপাড়ার সেকান্দর খাঁ, আশরাফ উদ্দিন খাঁ, আলাউদ্দিন খাঁ, ছেওপুরের আবাহনীর জয়, মোহামেডানের শুভ্র, মুক্তিযোদ্ধা দলের জনি, প্রাক্তন খেলোয়ার বিপ্লব, অবসর প্রাপ্ত খেলোয়ার অমল সেন, শৈলেন সাহা, মোক্তারপাড়ার আঃ জব্বার, জামরুল, বাবলু ধর কাটলীর মানিক সেন, সাকুয়ার সুনীল দত্ত, আমলীর সিদ্দিকুর রহমান, কয়রাটীর প্রয়াত খোরশেদ মিয়া ও কান্দুলিয়ার লাল মিয়া সবাই নেত্রকোণার কৃতি ফুটবল খেলোয়াড়।

 

(ঞ) বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধাঃ

আশরাফ উদ্দিন খান, প্রাক্তন এম.পি, গোলাম এরশাদুর রহমান, আঃ মান্নান তালুকদার, শামসুজ্জোহা, আঃ জব্বার, এডভোকেট আলতাফ উদ্দিন আহমেদ, আনোয়ার মাষ্টার, বজলুর রহমান ফকির, শামছুদ্দিন আহমেদ, আসু সিদ্দিক আহমেদ, আশরাফ আলী খান খসরু, এডভোকেট হাফিজুর রহমান খান, এডভোকেট শাফায়াত আহম্মদ খান, ইসলাম উদ্দিন কালা মিয়া, হায়দার জাহান চৌধুরী, জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, মোসলেহ উদ্দিন বীর প্রতীক, আব্দুল ওয়াহাব শাহজাহান, প্রয়াত গোলাম মোস্তফা, আবু আক্কাছ, আইয়ুব আলী, আঃ রহিম, ওবায়দুল হক রতন, এডভোকেট হাবিবুর রহমান, মোঃ জালাল উদ্দিন সুভাষ, খলিলুর রহমান খসরু (বীর প্রতীক), বুরহান উদ্দিন, প্রয়াত মিছির আলী, খন্দকার আনিছুর রহমান, মতিউর রহমান (খাদ্য পরিদর্শক), বর্ণীর আঙ্গুর মিয়া।

 

(ট) বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বঃ

কংগ্রেস নেতা বাংলার প্রয়াত মনোরঞ্জন সিংহ, ছোটগাড়ার উপেন্দ্র সরকার, পারলার যোগেন্দ্র তালুকদার, পুকুরিয়ার ধীরেন্দ্র মাষ্টার, ঠাকুরাকোনার শ্রী কান্তি মজুমদার, মনাং গ্রামের প্রতুল চন্দ্র ভট্রাচার্য্য, সাতপাই গ্রামের চন্দ্রকুমার ধর, কাইলাটীর এডভোকেট অখিল সেন। কংগ্রেসের দলীয় জনতার গণসঙ্গীত শিল্পী শীবনগর গ্রামের শ্রীমতি বিশুবালা রায়, উকিলপাড়ার চিরকুমার নরেন্দ্র কিশোর দত্ত, পুকুরিয়ার লোকনাথ চৌধুরী, কালী কুমার দাস, বর্ণী গ্রামের নগেন্দ্র সরকার, ঠাকুরাকোনার আটশি রায়, হিমাংশু আইন, নেত্রকোণা শহরের বাসন্তী রানী দাস, ঠাকুরাকোনার সুধীর মজুমদার। তাদের কেউ বর্তমানে জীবিত নেই, তবু জীবন্ত আছে ইতিহাস। নেত্রকোণার মুসলিমলীগ রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন কুমারপুরের ইনাম উদ্দিন উকিল, দেওপুরের এ.কে ফজলুল হক, বালি গ্রামের আশরাফ আলী আকন্দ, মদনপুরের নাবালক মিয়া প্রমুখ। কৃষক প্রজা পার্টিতে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্য ছিলেন বড় বাজারের মিয়া হোসেন ডাক্তার, মোক্তারপাড়ার ইজ্জত উল্ল্যাহ মোক্তার, মীর হোসেন মোক্তার, নবী হোসেন মোক্তার, মদনপুরের আঃ ওয়াহেদ বোকইনগরী প্রমুখ। ফরওয়ার্ড ব্লকের নেত্রকোণা সদর থানার ডাক্তার আনন্দ মোহন চক্রবর্তী, সুশীল চন্দ্র নিয়োগী, সুধীর মজুমদার, দক্ষিণা রঞ্জন ভট্রাচার্য্য। আর এস পি দলে নেত্রকোণা থানার ছেওপুরের মিয়াফর ছিলেন দলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। নেত্রকোণা সদর থানার আন্দামান ফেরত নেতা হলেন সচীনহোম, শচীন চক্রবর্তী, খুশুদত্ত রায়, ভূপেন ভট্রাচার্য্য, বিমল ভট্রাচার্য্য, দেবেস তালুকদার। নেত্রকোণা সদর থানার বালির হান্নান মৌলভী, বাংলার ফজর আলী, ডাক্তার খোরশেদ আলম, বাইড়াউড়ার শাহ্ আব্দুল মোতালিব প্রমুখ। ষাটের দশকের ছাত্র রাজনীতির প্রাণ পুরুষ ছিলেন নেত্রকোণার ইসলামপুরের মেহের আলী, সাতপাই এর জামাল উদ্দিন, কুড়পাড়ের শামসুজ্জোহা, বড়বাজারের টি.এ. রহমত উল্ল্যাহ, বাহির চাপড়ার এডভোকেট আঃ কুদ্দুছ, বাংলার নূরুল ইসলাম প্রমুখ। আওয়ামীলীগের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন নেত্রকোণার গাজী গোলাম মোস্তফা, ফজলুর রহমান খান, জাহেদ তালুকদার, সিরাজ আলী, আব্বাছ আলী খান, কে.এম ফজলুল কাদের এডভোকেট প্রমুখ। ন্যাপ রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন মালনীর গনি মিয়া, বালির সাফর উদ্দিন, মিসির আলী, বি.কে মিনার ও বিশিউড়ার ওয়াজেদ আলী প্রমুখ।

 

স্বাধীনতাত্তোর কালে বি.এন.পি, জাসদ, জাতীয় পার্টি সৃষ্টি হলে বি.এন.পি দলে নেত্রকোণার এডভোকেট আঃ কুদ্দুছ, দেওপুরের মারুফ, আইবপুরের শওকত আলী তালুকদার, বালির আবু আব্বাছ, এম.পি, বাংলার নুরুল ইসলাম, মইনপুরের আবু কাওসার আহমেদ, বাইশদারের শফিকুল কাদের, দেওপুরের শফি আহমেদ, কালিয়ারা গাবরাগাতির চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন মিলকী, মেদনীর চেয়ারম্যান সামছুদ্দিন, কাইলাটীর আঃ মোতালিব, মদনপুরের ময়না মিয়া, বাহির চাপড়ার গোলাম রব্বানী নেতৃত্বে অসীন হন। জাসদে মেদনীর গাজী দিলোয়ার হোসেন, বাংলার বাদল বিশ্বাস, চল্লিশার খন্দকার সোলায়মান, জাতীয় পার্টির আশরাফ উদ্দিন খান নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। জামাতে ইসলামীর মৌলানা ফজলুল করিম, ইসলামী ঐক্যজোটে মৌলানা রইছ উদ্দিন আকন্দ।

 

(ত) বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বঃ

সাতপাইয়ের প্রয়াত গোপাল দত্ত, উলুয়াটীর ফজর আলী, বংশী বাদক কালু মিয়া, তবল বাদক ভক্ত দাস, কাজল শীল, মোক্তারপাড়ার সবিতা সেন, নমিতা দত্ত, সঞ্চিতা দত্ত, চন্দন দত্ত, বংশী বাদক বারী সিদ্দিকী, টিভি অভিনেত্রী অপু সরকার ও শ্রাবন্তী দত্ত, চারু-কারু শিল্পী আমতলার শ্যামল চৌধুরী, রফিক মাহমুদ, দুলাল পত্রনবীশ, বিপুল চৌধুরী পলু।